22 September 2026 Tuesday, 05:35 PM
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ মঙ্গলবার, 05:35 PM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

শৈশব যেন থেমে না যায়

21 September 2026 05:54 PM 17 ভিউ সাইমুল আলম সৈকত, কমিউনিটি মোবিলাইজার

শৈশব যেন থেমে না যায়

নদীর জলে তখন শেষ বিকেলের আলো ঝিলমিল করছে। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ বল নিয়ে ছুটছে, কেউ আবার নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে—এ যেন আর দশটি গ্রামের স্বাভাবিক শৈশবের ছবি।

কিন্তু একটু কাছে গেলে বোঝা যায়, এই মাঠে খেলতে থাকা সব শিশুর হাতে স্কুলের ব্যাগ নেই।

কেউ স্কুল থেকে ফিরে এখানে আসে, আবার কেউ স্কুলেই যায় না।

কেউ বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যায়, কেউ পরিবারের কাজে হাত লাগায়। কেউবা সারাদিন এই মাঠ আর নদীর পাড়েই ঘুরে বেড়ায়। তাদের শৈশবের দিনগুলো কেটে যায় খেলাধুলা আর জীবনের ছোট ছোট সংগ্রামের মধ্যে।

ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিরহাট গ্রামের এই মাঠটি তাই শুধু একটি খেলার মাঠ ছিল না। অনেক শিশুর কাছে এটি ছিল তাদের প্রতিদিনের ঠিকানা।

আর সেই মাঠেই একদিন শুরু হয়েছিল একটি ভিন্ন গল্প।

২০২৫ সালে সুশীলনের Social and Behavior Change (SBC) Project—এর মাঠ পর্যায়ের কাজ করতে গিয়ে শান্তিরহাট গ্রামের শিশুদের সঙ্গে পরিচয় হয়।

প্রথমে তারা আমাকে অন্য সবার মতোই দেখত। একজন অপরিচিত মানুষ।

কিন্তু আমি তাদের শুধু কাজের অংশ হিসেবে দেখতে চাইনি। তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। জানতে চাইলাম তাদের কথা, তাদের দিন কাটে কীভাবে, কী ভালো লাগে, কী করতে চায়। তারপর একদিন খেয়াল করলাম—ওদের দিনের একটা বড় অংশ কেটে যায় নদীর পাশে।

তখন একটা বিষয় আমাকে ভাবিয়ে তুলল। যে নদী ওদের শৈশবের সবচেয়ে কাছের, সেই নদীতেই অনেক শিশু ঠিকমতো সাঁতার জানে না। শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রথমেই তাদের স্কুলে পাঠানোর কথা বলা হয়নি। প্রথমে তাদের বন্ধু হতে হয়েছে। তাদের সঙ্গে মাঠে কথা হয়েছে, নদীর পাড়ে বসে গল্প হয়েছে। তারা কী করে, কোথায় যায়, কী ভালোবাসে, স্কুলে কেন যায় না—এসব জানতে সময় দেওয়া হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের যোগাযোগই ধীরে ধীরে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে।

শিশুরা নিজেদের কথা বলতে শুরু করে। তাদের পরিবারের কথাও জানা যায়। তখন স্পষ্ট হতে থাকে, কারা বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে এবং কারা পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছে।

কিন্তু তার আগে আরেকটি বিষয় সামনে আসে—নদী। শান্তিরহাটের শিশুদের জীবন নদীকে ঘিরে। নদীর পাড় তাদের খেলার জায়গা, আর অনেক পরিবারের জীবিকারও অংশ।

তাই তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে, এই শিশুদের জন্য সাঁতার শেখা শুধু আনন্দের বিষয় নয়—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা।

শিশুদের সাঁতার শেখার গুরুত্ব সম্পর্কে কাউন্সেলিং করা হয়। শুধু কথা বলে থেমে না থেকে তাদের আস্থা ও আগ্রহ তৈরি করতে নিজেই নদীতে নেমে সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে একজন আনসার সদস্যকেও সঙ্গে রাখা হয়।

সাঁতারের সেই সময়গুলোতে শিশুরা আরও কাছে আসে।কথা বাড়ে। আর সেই কথার মধ্যেই একদিন একে একে বেরিয়ে আসে তাদের জীবনের অন্য গল্পগুলো—স্কুলে না যাওয়ার গল্প, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার গল্প, আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকা কিছু ছোট্ট স্বপ্নের গল্প।

বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা ও ঝরে পড়া শিশুদের তালিকা তৈরি করা হলো। তাদের নিয়ে আলোচনা করা হলো। এরপর শুরু হলো পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ। এখানে সবচেয়ে বড় কাজ ছিল শুধু ভর্তি করানো নয়; পরিবারকে বোঝানো।

কারণ একটি দরিদ্র পরিবারের কাছে শিশুকে স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত অনেক সময় সহজ নয়। সেখানে শিশুর শ্রম, পরিবারের কাজে সহযোগিতা কিংবা দৈনন্দিন জীবিকার চাপকে অগ্রাধিকার দেওয়া স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।

তাই একদিনের কথায় পরিবর্তন আসেনি। বারবার কথা বলতে হয়েছে। পরিবারের বাস্তবতা বুঝতে হয়েছে। তাদের বোঝাতে হয়েছে—আজকের অভাব যেন সন্তানের পুরো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না দেয়। এই দীর্ঘ পথচলার মাঝেই সামনে আসে ইসরাফিল। ইসরাফিলের চোখে ছিল স্কুলের স্বপ্ন, ইসরাফিল তখনও স্কুলের ছাত্র নয়। কিন্তু স্কুলের প্রতি তার টান ছিল।

কখনো বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে যেত, কখনো স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকত। অন্য শিশুরা যখন বই—খাতা হাতে শ্রেণিকক্ষে ঢুকত, সে হয়তো দূর থেকে তাকিয়ে থাকত।

হয়তো সে জানত না কীভাবে স্কুলে ভর্তি হতে হয়। কিন্তু সে জানত—সে স্কুলে যেতে চায়।

ইসরাফিলের পরিবার ছিল খুবই অসচ্ছল। পরিবারের সদস্য তিনজন। তার বাবা বয়সের ভারে দুর্বল। একটি পা প্যারালাইজড হওয়ায় নিয়মিত কাজ করাও কঠিন। তারপরও সংসার চালাতে যখন যে কাজ পান, সেটিই করার চেষ্টা করেন। এই পরিবারের কাছে ইসরাফিলের পড়াশোনা ছিল একটি কঠিন সিদ্ধান্ত। তার মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় জানতে চাওয়া হলো—যদি ইসরাফিলকে বিনা খরচে স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে তিনি কি তাকে স্কুলে পাঠাবেন?

প্রশ্নটি শেষ হওয়ার আগেই যেন একজন মায়ের বুকের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো বেরিয়ে এলো। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বললেন—

বাবা, “আমি আমার ছেলেকে লেখাপড়া করাবো এবং তাকে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই।”

সেই মুহূর্তে কথাটি শুধু একজন মায়ের কথা ছিল না। এটি ছিল একটি পরিবারের দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে সন্তানের জন্য ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।

ইসরাফিলের বড় ভাই ঢাকায় নিজের সংসার নিয়ে থাকেন। পরিবারের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই ছোট ছেলে ইসরাফিলকে ঘিরেই মায়ের স্বপ্ন। দীর্ঘ সময়ের যোগাযোগ ও কাউন্সেলিংয়ের পর সেই স্বপ্নের প্রথম দরজা খুলে যায়।

২০২৬—যে বছর সাতটি স্বপ্ন স্কুলে ফিরল—

২০২৫ সালে শুরু হওয়া পরিচয়, যোগাযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি কাজের ধারাবাহিকতা ২০২৬ সালে এসে একটি দৃশ্যমান ফলাফল তৈরি করে।

ইসরাফিল একা নয়—তার সঙ্গে আরও ছয়জন শিশু ফিরে আসে বিদ্যালয়ের পথে। ( নাফিজা, ইসরাফিল, আব্দুর রহিম, আব্দুর রহমান, আল—আমিন, হোসেন, আহাদ ) মোট সাতজন ঝরে পড়া ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুকে ৫৬ নম্বর শান্তিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে ভর্তি করানো হয়।

তাদের উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিশুদের জন্য স্কুল ড্রেসের ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করেন।

কাজটি তাই শুধু ভর্তি পর্যন্ত থেমে থাকেনি। চেষ্টা ছিল, শিশুরা যেন বিদ্যালয়ে গিয়ে টিকে থাকতে পারে। শুধু শিশুদের শিক্ষায় নয়, এই কমিউনিটিতে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতা, টাইফয়েড টিকাদানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে তৈরি হয়েছে আস্থা।

আজ সেই মানুষগুলো যখন আমাকে আলাদা মর্যাদা দিয়ে গ্রহণ করেন, তখন মনে হয়—একজন মাঠকর্মীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তার পদবি নয়, মানুষের বিশ্বাস।

আমি চাই না, কোনো শিশু শুধু তার বাবার পেশার কারণে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে ফেলুক।

জেলের সন্তান চাইলে জেলে হবে—এতে কোনো অসম্মান নেই। কৃষকের সন্তান কৃষক হতে চাইলে সেটিও সম্মানের। কিন্তু সিদ্ধান্তটি যেন শিশুটির নিজের হয়। সে যেন বলতে পারে—আমি কী হব, সেটা আমি ঠিক করব। এই সুযোগটুকুই হয়তো শিক্ষার সবচেয়ে বড় উপহার।

শান্তিরহাটের সাত শিশুর গল্প তাই শুধু সাতটি শিশুর স্কুলে ভর্তি হওয়ার গল্প নয়। এটি সাতটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার গল্প।

আর সেই গল্পের শুরু হয়েছিল একটি নদীর পাশে, একটি ছোট্ট মাঠে—যেখানে শিশুরা প্রতিদিন খেলত।

আজও তারা সেখানে খেলে। শুধু পার্থক্য একটাই—

আগে সেই মাঠ ছিল তাদের শৈশবের ঠিকানা। এখন সেখান থেকে তাদের স্কুলের পথও শুরু হয়।

আমি যখন অন্য কোনো কাজেও সেই এলাকায় যাই, তখন অজান্তেই চোখ খুঁজে ফেরে সেই শিশুদের। দূর থেকে যখন দেখি তারা স্কুলের পোশাক পরে যাচ্ছে, বুকের ভেতর কেমন একটা শান্তি লাগে। এই দৃশ্যগুলো হয়তো খুব ছোট। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করা একজন মানুষের কাছে এগুলো অনেক বড় অর্জন। যে শিশুকে একদিন নদীর পাড়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে দেখেছিলাম, আজ সে বই হাতে স্কুলে যাচ্ছে। কোনো কোনো দিন তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, “পড়াশোনা কেমন চলছে?” তারা হয়তো ছোট্ট করে উত্তর দেয়। কেউ হাসে। কেউ গল্প শুরু করে। আর তখন মনে হয়—এই তো, এতদিনের পথটা বৃথা যায়নি।

তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ শান্তিরহাটের সব শিশুকে এখনো স্কুলে আনা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু তাদের সঙ্গে সম্পর্কটাও শেষ হয়ে যায়নি। বরং আজও দূর থেকে আমাকে দেখলে অনেক শিশু দৌড়ে আসে। কেউ হাত ধরে।কেউ গল্প করে।কেউ হয়তো শুধু পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকে।

এই সম্পর্কের কোনো অফিসিয়াল নাম নেই। কোনো রিপোর্টের পাতায় এর পুরো হিসাবও লেখা যায় না। তবু এই সম্পর্কই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—

পরিবর্তন সবসময় বড় কোনো কাজ দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো একটি শিশুর পাশে বসে তার কথা শোনা দিয়েও শুরু হয়।

আমি জানি না, সেই সাতটি শিশুর ভবিষ্যতে কে কী হবে। হয়তো কেউ শিক্ষক হবে।হয়তো কেউ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।হয়তো কেউ অন্য কোনো পেশায় যাবে।

কিন্তু আমি শুধু এটুকু চেয়েছি— জেলের ছেলে যেন শুধু জেলে হওয়াকেই তার একমাত্র ভবিষ্যৎ না ভাবে। রিকশাচালকের ছেলে যেন শুধু বাবার রিকশার হাতলকেই তার ভবিষ্যৎ না ভাবে।

দারিদ্র্যের ঘরে জন্ম নেওয়া একটি শিশু যেন কোনোদিন মনে না করে “আমার জন্য এর চেয়ে বড় স্বপ্ন নেই।”

কারণ একটি শিশুর জন্ম তার ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেয় না। তার চারপাশের সুযোগ, মানুষের সহযোগিতা আর নিজের স্বপ্ন—এসবই একদিন সেই ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

সুশীলন ও UNICEF —এর এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার লক্ষ্য শুধু আজকের পরিবর্তন নয়—এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করা, যেখানে কোনো শিশুর স্বপ্ন তার পরিবারের আর্থিক অবস্থান, পেশা কিংবা সীমাবদ্ধতার কাছে হার মানবে না।

কারণ প্রতিটি শিশুরই অধিকার আছে স্বপ্ন দেখার, শেখার এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজে বেছে নেওয়ার।

সেই স্বপ্নের পথচলায় সুশীলন ও টঘওঈঊঋ পাশে আছে—আজ, আগামীকাল এবং আরও অনেক শিশুর ভবিষ্যতের জন্য।

 

প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ন ইভেন্ট সংখ্যা: ৩
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র