22 September 2026 Tuesday, 05:35 PM
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ মঙ্গলবার, 05:35 PM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

জীবন যুদ্ধ পেরিয়ে স্বপ্নের দুয়ারে.............

21 September 2026 04:22 PM 11 ভিউ রিমা আক্তার, কালচারাল টিম ম্যানেজার

জীবন যুদ্ধ পেরিয়ে স্বপ্নের দুয়ারে.............

একটি ফুল কোথায় আর কিভাবে জন্মাবে সেটি যেমন সে জানেনা! ঠিক তেমনি একটি মানুষ জন্মেই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। সময়ের শ্রোতে পরিবার,পারিপার্শ্বিক অবস্থান,শিক্ষা আর তার মনের প্রবল ইচ্ছাই তাকে অধিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে।

ভাবছেন এগুলো কেন বলছি?

হুম কারন তো একটা আছেই,,, সালটি ১৯৯৬, সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার গোয়ালডাঙ্গা গ্রামের অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম আমার। বাবা মায়ের ৩য় কন্যা সন্তান হিসেবে ভূমিষ্ট হলাম মাঘ মাসের কনকনে শীতে। বংশের মুখে বাতী জ¦লে উঠবে ভেবেছিলো পরিবার! অর্থাৎ দুটি কন্যা সন্তানের পর এবার হয়তো পুত্র সন্তান আসবে পরিবারে। কিন্তু তা আর হলো না!

দাদী নাম রাখলেন রিমা,,,

এভাবেই কাটতে লাগলো দিন, কিছুদিন পর সবাই ফিরে এলো খুলনায়। আমার জন্মের আগেই বাবার কাঁধে বিশাল এক ঋণ এর বোঝা! কোনো মতে সংসার চলে তখন,,,, এরপর পরিবারে এলো আরো দুজন সদস্য,,, চার বোন ও এক ভাই সহ ৭ সদস্যের সংসারে একবার চুলো জ¦ালানোই ছিলো কষ্টসাধ্য ব্যাপার! আর হ্যা অবশেষে বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে পুত্র সন্তান এসেছে আমাদের পরিবারে। বাবা পেশায় দিনমজুর,

গানের ভুবনে আমি:

আমার বাবা মা কে ছোটবেলা থেকেই দেখেছি ভান্ডারী ভক্ত, একবার আমাদের বাড়ির উঠানে এক বিশাল ভান্ডারী গানের আয়োজন করলো এলাকাবাসীরা মিলে। আমার তখন ৪ বছর বয়স। রাতে একটি গানের মুখরা শুনে ঘুমিয়ে পড়লাম, পরেরদিন সকালে মনের অজান্তেই সেই চার লাইন গান গাইতে শুরু করে দিলাম ,,, আমাদের চাচের বেড়ার ঘর ছিলো,,, তাই পাশের ঘরে বসে থাকা রাতের গান গাওয়া শিল্পী আমার মাকে ডেকে জানতে চাইলেন কে গাইছে? মা বললেন আমার সেজো মেয়ে। তিনি অবাক হয়ে বললেন ওর বয়স কত? এই গান কি আগে কখনো শুনেছে? মা হেসে জবাব দিলেন চার বছর মামা,,,এই গান ও কোথায় শুনবে! রাতে ঘুমানোর আগে যতটুকু শুনেছে ততটুকু গাইছে। তিনি (শিল্পী) বেশ আবদারের সাথে মাকে বললেন — মামী আপনার মেয়েটাকে ভান্ডারী গান শেখাতে চাই। মা প্রথমদিকে রাজি না থাকলেও পরবর্তীতে রাজী হলেন এবং শুরু হলো আমার গানের যাত্রা,,,,,।

কিন্তু তাতে আরো জটিলতা তৈরী হলো আমার ওস্তাদ ছিলেন অন্ধ এবং যশোরে তার বাড়ি,আবার হারমোনিয়াম বা অন্য কোনো যন্ত্র কেনার সামর্থ ও আমাদের নেই তার উপরে আমি তখন লিখতে ও পারি না! তাহলে গান কিভাবে শিখবো? ওস্তাদ যখন কোনো অনুষ্ঠানের জন্য খুলনায় আসতেন তখন আমাদের বাসায় এসে খালি কন্ঠে গান গাইতেন— তা শুনে এক বড় ভাই খাতায় লিখে রাখতেন, আর আমার এক কাকা টিনের হাড়ি বাজিয়ে মাঝে মাঝে সেই গান আমাকে শেখাতেন। প্রথমবার স্টেজে গান করি ৪ বছর বয়সে বাগেরহাট খানজাহান আলীর মাজারে,হাজারো দর্শকের সামনে! বেশ ভালই চলছিলো আমার গান,,, কিছুদিনপর মা তাবলিক আর মহিলাদের জামাতে যাওয়া শুরু করলেন আর আবিষ্কার করলেন গানবাজনা হারাম,,, মেয়ের গানের জন্য স্বপরিবারে আমরা দোযখে যাবো!  তার উপেরে দাদীর বকুনি,,, প্রায়ই মাকে এসে বকতেন আমাকে গান শেখানোর জন্য,,,শেষমেষ আমার গান বন্ধ। কিছুদিন পার হলেই মায়ের আবার সুমতি হলো এবং আমি পুনরায় গান গাইতে শুরু করলাম।

বাবা স্টেজে গান গাওয়ার জন্য একটা স্কাট কিনে দিয়েছিলেন যেটা পেয়ে মনে হয়েছিলো স্বর্গের সুখ আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। ঐ একটা স্কাট যে আমি কতগুলো স্টেজে পড়েছি,,, তা বলা সম্ভব নয়।

 আমি আর আমার ছোট বোন ছিলাম মানিক জোড়,,, যেমন একসাখে খেলতাম আবার রাগ হয়ে গেলে একে অপরের মুখে খামছি দিয়ে রক্ত বের করে ফেলতাম। এখন ও দুবোনের গালে নখের দাগ বিদ্যমান। পরিবারে যে অভাব অনটন আমরা দেখেছি তা লিখে বোঝানো বেশ অসম্ভব। আমরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম সেখানে দশটা ঘর ছিলো ,,, সব ঘরেই দুপুর বেলা রান্না হতো শুধু আমাদের ঘর ছাড়া! বাবা সারারাত রাস্তা পাহাড়ার কাজ করতেন আর ভোরে এসে ঘুমাতেন। দুপুরে উঠে রিক্সা চালাতে যেতেন সন্ধ্যায় কোনোমতে যা পেতেন তাই এনে দিলে মুদি দোকানে যা পাওয়া যেতো তাই দিয়ে রান্না করতেন মা। আমি বেশির ভাগ রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে যেতাম, সকালে উঠে ঠান্ডা ভাত বা পান্তা ভাত খেতাম। আমি আর আমার ছোট বোন মাঝে মাঝে ক্ষুদার জ¦ালা সহ্য করতে না পেরে বাবাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে  তোলার চেষ্টা করতাম, টাকা চাইতাম ,, কোনোদিন ১ টাকা দিতো আবার কোনোদিন বকা দিয়ে তাড়িয়ে দিতো। নাইট ডিউটি করে এসে ঘুমাতেন তাই ঘুমের ঘরে কি বলতেন বুঝতে পারতেন না। আমরা যদি বলতাম বাবা টাকা দাও খিদে লাগিছে বাবা বলতেন— বারান্দা থেকে হেটে আয়,,, আবার কখনও বলতেন মাটির কলসে পানি আছে তাই খা,,! আশপাশের ঘরগুলো থেকে মাঝে মাঝে খাবার দিতে চাইতো দুবোনকে, কিন্তু আমরা কখনোই তা নিতাম না,, আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম দুপুরে যদি কেউ ভাতের মাড়/ফ্যান গালে তাহলে সেটা নিয়ে খাবো। বেশীরভাগ ঘরেই বসা ভাত অর্থাৎ মাড় ছাড়াই ভাত  রান্না করতো! কখনো কখনো তারাও যখন বসা ভাত রান্না করতেন সেদিন আর আমাদের কপালে ফ্যানটুকুও জুটতো না।

এবার আসি লেখাপড়ায়,,, স্কুলে তো ভর্তি করছিলো,,, কিন্তু স্কুলের যে প্রযোজনীয় সরঞ্জাম তা কখনোই বাবা কিনে দিতে পারতেন না। তাই স্কুলে যাবার ইচ্ছা ও কমতে শুরু করে। কোনোমতে টেনে টুনে ৪র্থ শ্রেণীতে উঠলাম,,, কিন্তু স্কুল আর ভালো লাগে না। আর পরিবারের এই অবস্থাও সহ্য হয় না তাই এবার এলাকার স্বনামধন্য শিল্পী চললেন অন্যের বাসায় কাজ করতে! আমার যতদূর মনে পড়ে আমি প্রায় ১০ টি বাড়িতে নানা ধরনের ঘরোয়া কাজ করে পরিবারকে আর্থিক সহযোগীতা করতাম।

আমার জীবনে রূপান্তর:

৪র্থ শ্রেণীতে ওঠার পর লেখাপড়া বন্ধ, ভেবেছিলাম আর বোধহয় স্কুলে যেতে হবে না। এরপর সন্ধান মিললো এনজিও রূপান্তর এর। ২০০৫ সালে তারা সাংস্কৃতিক কর্মী নিযোগের জন্য সার্কুলার দিলেন, আমি ও চলে গেলাম পরীক্ষা দিতে এবার চাকরী করবো আর লেখাপড়া করবো না! পরীক্ষা দিলাম, ৫ দিনের কর্মশালাও করলাম এবার ফলাফলের পালা,,, কিন্তু কতৃর্পক্ষ জানালেন শিশুদের তো কাজে নেওয়া যাবে না,,, যদি থাকতে চাই তাহলে শিশু শিল্পী হিসেবে থাকতে পারি শর্ত একটাই লেখাপড়া করতে হবে এখানে থাকতে চাইলে বড় হলে তারপর চাকুরী। আর শিশু শিল্পী হিসেবে কিছু ভাতা পাওয়া যাবে। আমার বাবাকেও ডাকা হলো,,, আমি বাবাকে বললাম বাবা চলো বাড়ি যাই,, লেখাপড়া করবো না বলে এখানে এলাম, এখন এরা বলছে লেখাপড়া করতে হবে! বাবা বললেন মারে ,,, এনারা লেখাপড়া করাবেন তুমি গান ও গাইতে পারবে আর কিছু টাকাও তো পাবে এখানে থেকে অন্তত লেখাপড়াটা শেখো। শুরু হলো আমার জীবনের রূপান্তর,,,

২০০৬ সালে ভর্তি হলাম ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে... গান এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন লোকসঙ্গীত ও দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্টানে যোগদান সহ নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হলাম। ধীরে ধীরে পরিবারের অভিভাবক হিসেবে সকল দায়িত্ব নেওয়া শুরু করলাম। ছোট্ট এই জীবনে রূপান্তর সংস্থার যে অবদান রয়েছে আমার উপর তার জন্য আমি চির কৃতজ্ঞ থাকবো।

২০১৭ সালে আমি অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্রী, রূপান্তর থেকে চলে এলাম,  স্বপ্না দিদি তখন সুশীলনে চাকুরী করে দিদির সাথে রুপসা ব্রীজের নিচে দুইটা দোকান নিলাম,,, শুরু হলো এক নতুন অধ্যায় একটাতে চা,কফি,চটপটি,ফুচকা,আর  অন্যটাতে হাতে তৈরী শাড়ী ও কসমেটিক। ব্যবসা বেশ ভালোই জমে উঠলো,,, । কিছুদিন পর স্বপ্না দিদির সাথে সুশীলন এ ঘুরতে এলাম। রূপান্তরে কাজের সুবাদে সুশীলন সাংস্কৃতিক দলের অধিকাংশ সদস্যদের সাথেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই দেখা হতো তাই পূর্ব পরিচিত মানুষদের সাথে এসে গল্প করতে করতে উজির ভাই কালচারাল টীমে যোগদানের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু প্রথম দফাতে সেই প্রস্তাব খারিজ করে সেদিনের মতো বিদায় নিলাম। এর কিছুদিন পর একটা অনুষ্ঠানে অতিথী শিল্পী হিসেবে ডাক পাই সুশীলন থেকে। ৩ দিন ব্যাপী আয়োজিত উরন্নয়ন মেলাটি সি এস এস আভা সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় যেখানে প্রথমবার উপকূলবন্ধু আমার গান শোনেন, পরবর্তীতে তিনিও কালচারাল টীমে যোগদানের আহ্বান জানান, কিন্তু দোকান রেখে ঐ মুহুর্তে চাকুরী করা বেশ কঠিন হয়ে যেতো তাই এবারো চলে গেলাম। এরপর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কক্সবাজারে এলে সুশীলন এসিএফ এবং বি পি আর এম দুটো দাতা সংস্থার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনার সুযোগ পায়, এবারো ডাক আসে আমার ৬ মাসের জন্য,,, ততদিনে পরীক্ষাও শেষ, আবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ পেলেও কক্সবাজারে যতবার যেতে চেয়েছি ততবারই কোনো না কোনো কারনে আর যাওয়া হয়নি। তাই এবারের ডাক আর ফেরাতে পারলাম না ৬ মাসের জন্য রওনা হলাম কক্সবাজার,,,,

সুশীলন আমার পরিবার:

৬ মাসের অতিথি হয়ে সুশীলন পরিবারে এসেছিলাম,কখন যে পরিবারের সদস্য হয়ে গেছি তা বুঝে ওঠার আগেই কেটে গেছে ৯ টি বছর,,, । এই পরিবার আমাকে স্বাবলম্বী হতে শিখিয়েছে, দিয়েছে মর্যাদা,দিয়েছে ভালোবাসা,নিয়েছে আপন করে। এই পরিবারে এসে শুধু সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নয় নানাবিধ কাজের সাথে যুক্ত হবার সুযোগ ও নিজের ভিতরের শক্তি খুঁজে পেতে স্বমর্থ হচ্ছি। বিভিন্ন প্রকার অনলাইন প্লাটফর্ম আমাকে রিমা হিসেবে পরিচিত করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে প্রাণে প্রাণে মিল করে দাও অনুষ্ঠান আমাকে সুশীলন পরিবারের সদস্যদের কাছে অধিক পরিচিত করে তুলেছে।

বর্তমানে আমি সুশীলন পরিবারে কালচারাল টীম ম্যানেজার হিসেবে আছি, পাশাপাশি আত্মউন্নয়নের সন্ধানে প্লাটফর্মে ৭ নং কালচারাল গ্রুপের লিড ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে ও ১০ টি ইভেন্টের ১ টির টীমলিডার সুশীলনের বিভিন্ন কমিটির দুটির সাধারণ সদস্য হিসেবে রয়েছি।

আমি যে পরিবেশে জন্ম নিয়েছি এবং যে দারিদ্রতা দেখেেছি সেখানে যদি থেমে যেতাম তাহলে আজকের আমি আর কখনোই প্রকাশ পেতো না! কিন্তু অভাব বা পরিবেশ কিছুই আমার প্রতিবন্ধকতা নয় ,,, আমার ইচ্ছা আর প্রচেষ্টা তার চেয়েও অনেক বড়।

সংগ্রামী নারীর গল্প সংখ্যা: ৩
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র