28 June 2026 Sunday, 01:44 AM
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ রবিবার, 01:44 AM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

আমার জীবনের গল্প, নাদিয়া আফরিন প্রকল্প সমন্বয়কারী

26 June 2026 03:24 PM 42 ভিউ নাদিয়া আফরিন প্রকল্প সমন্বয়কারী

আমি নাদিয়া আফরিন। পরিবারের সবাই অবশ্য আমাকে কল্পনা বলে ডাকে। আমি যখন আমার মায়ের ৮ মাসের গর্ভে তখন আমার বাবা আরেকটি বিয়ে করেন এবং আমার মায়ের উপর অত্যাচার শুরু করেন। আমার মা ওই অবস্থায় ওই সংসারে  অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমার নানার কাছে চলে আসে খুলনায়। তার কিছুদিন পর ৬ ই সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ সালে নানা বাড়িতেই আমার জন্ম। সেই সময় আমার বাবা পাকিস্থানে অবস্থান করছিলেন। চিঠির মাধ্যমে জানেন তিনি কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছেন, এই খবরে তিনি খুশি হতে পারেন নি তাই আমাকে দেখতেও আসেননি।

আমি বড়ো হতে থাকি আমার নানার বাড়িতে আমার মায়ের সাথে। আমার নানার খুলনা নতুন বাজারে মেট্রো টেইলার্স নামে তার একটি দর্জি দোকান ছিলো। এই দোকানের আয় থেকেই তিনি পরিবারের খরচ চালাতেন। এই স্বল্প আয়ে ৭ জনের সংসার এর খরচ চালাতেই তার কস্ট হতো তাই আমার খরচ চালাতে তিনি আরও বেশি হিমশিম খেতেন। এই অবস্থায় আমার বড়ো খালা—খালু আমার ভরণ—পোষণের দায়িত্ব নেন। এভাবে আমি স্কুল জীবন শুরু করি রুপসা প্রাইমারি স্কুল থেকে। এরই মাঝে আমার নানা ব্রেইন স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে গেলে আমি আমার বড়ো মামার বাসায় থাকা শুরু করি , তবে সেখানে আমার মামি আমাকে ঠিক ভাবে মেনে নেয়নি, অনেক মানসিক অত্যাচার করেছেন তিনি আমাকে, এমনকি আমাকে ঠিক মতো খেতে পর্যন্ত দিতো না।  তখন আমার খালা—খালু আমাকে তার বাসায় নিয়ে আসে। এসএসসি শেষ করি পাইওনিয়ার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এরপর ইন্টারমিডিয়েটে পাইওনিয়ার গার্লস কলেজে ভর্তি হই। খালার বাসায় থেকে আমার পড়াশোনা চালাতে থাকি। ক্লাস ৬ থেকে আমার পড়াশোনার দায়িত্ব আমার খালার পাশাপাশি  আমার মেজো মামা নেন কারণ তিনি তখন তার চাকুরি জীবন শুরু করেন। আমি ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে টাকার অভাবে অনার্সে সরকারি আজম খান কমার্স কলেজে ভর্তি পরিক্ষায় উত্তীর্ন হয়েও ভর্তি হতে পারিনা, আমার মামাকে জানালে তিনি বেশি খরচের কারণে আমাকে ভর্তি হতে নিরুৎসাহিত করে। তখন উপায় না পেয়ে আমি ডিগ্রি তে ভর্তি হই ও ক্লাস শুরু করি। এরই মাঝে কলেজে ২ টি ডিপার্টমেন্ট নতুন ওপেন করার কারণে অনার্সে ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করা ছাত্র—ছাত্রীদের ডিগ্রি থেকে অনার্সে একই ভর্তি ফি তে ট্রান্সফার হওয়ার সুযোগ দিলে আমি এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ডিগ্রি থেকে অনার্স ব্যবস্থাপনা বিভাগে ট্রান্সফার হই। উল্লেখ্য যে ১ম শ্রেনী থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত আমার কোন কোচিং সেন্টার বা কোন শিক্ষকের কাছে পড়া হয়নি, সহপাঠিদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে এবং খালাতো—মামাতো ভাই বোনের পুরাতন বই দিয়েই পড়ালেখা করে আমার সামনে এগোনো। বাবা না থাকায় পরিবার, সমাজ সবার কাছেই আমি অপমানিত, অবহেলিত হয়েছি সব সময়। 

 অনার্স ১ম বর্ষে পরিক্ষা দেওয়ার পরপরই আমি আমার জীবনের সব থেকে বড়ো একটা ভুল করে বসি, আমি একজনকে পরিবারের অমতে বিয়ে করি, তবে আমার মা জানতেন শুধু। আসলে তখন সবার অতিরিক্ত অবহেলা, পারিবারিক অশান্তি আর অভাব থেকে মুক্তি পেতে আমার এমন একটি ভুল সিদ্ধাšত নেওয়া, তাছাড়া বয়স ও কম ছিলো। বিয়ের পর আমি তার সাথে ঢাকায় চলে আসি এবং একটি স্কুলে জুনিয়র শিক্ষিকা হিসেবে জয়েন করি। আর সাথে টিউশনি করি। এর কিছুদিন পরে আমি  জানতে পারি যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে তিনি আগে থেকেই বিবাহিত এবং তার ২য় বিয়ের কথা প্রকাশ পাওয়াতে ১ম স্ত্রীর বাড়ি থেকে নারী নির্যাতনের কেইস করে তার নামে এবং কালক্রমে তিনি ওয়ারেন্ট এর আসামী হয়ে যায়। আমি শোনা মাত্র অসহায় হয়ে যাই কারণ বাবা থেকেও নেই , মায়েরও আয় নেই আবার নানাও মারা যায় , কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় এই সংসারে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। কেইস টা গ্রামের চেয়ারম্যান কে দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে ১ লক্ষ টাকায় সমাধান হয়,তখন এই টাকা আমার মামাদের কাছ থেকে আনার জন্যে আমার স্বামী ও শশুর বাড়ির লোকজন চাপ প্রয়োগ করলে আমি অপারগতা প্রকাশ করি এবং নিজেই এই টাকার পুরোটাই বিভিন্ন এনজিও সমিতি থেকে লোন নিয়ে স্কুলের বেতন ও টিউশনির টাকা থেকে শোধ করি আমি। কিন্তু এই ঘটনার পর আমার ও্্্্্্্্্্পরে আমার স্বামী বিভিন্ন ওযুহাতে শারিরীক ও মানষিক অত্যাচার করতে থাকে আর অমি সহ্য ধৈর্য্য নিয়ে থাকি, কারণ তিনি জানতেন আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। শত কস্টের মাঝেও আমি আমার পড়ালেখা নিজ খরচে চালিয়ে যাই এর মাঝে আমার অনার্স এবং মাষ্টার্স কমপ্লিট হয় এবং আমি প্রয়াত শাহিনা পারভিন এ্যানী আপার সহযোগিতায় সুশীলন সংস্থায় এমআর প্লাস নামে একটি প্রকল্পে উপজেলা সমন্বযকারী হিসেবে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে যোগদান করি। তবে আমার আয়ের পুরো টাকাই সংসার খরচে দিতে হতো, এক পর্যায়ে আমার ছেলে হওয়ার সময় শারিরিক অবস্থা বেশি খারাপ হলে আমি চাকরি থেকে রিজাইন দেই , এই সময়টা আমার মা আমাকে মানষিক ভাবে অনেক সাপোর্ট দিতে থাকে। আমি তখন ঢাকাতে একটা মাল্টিপারপাস কোম্পানিতে ফিল্ড অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করি ঢাকাতে এবং আমার ছেলের সমস্ত খরচ চালাতাম। ছেলের বাবা সংসারে কোন টাকা খরচ করতে চাইতো না।

আমার ছেলের জন্মের ১ বছর পর আমার মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং ২০১৭ সালে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পরে আমি আবার অসহায় হয়ে পড়ি কারণ তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় আমাকে আগলায় রাখতেন সব বিপদে। পরে উপায় না পেয়ে আমি ২০১৭ সালেই  সুশীলনের নির্বাহী প্রধাণ মহোদয়ের সাথে দেখা করে আমার সমস্যার কথা জানাই, এর কিছুদিন পর আমি আবার সুশীলনে একটি প্রকল্পে যোগদান করে আমার কর্ম জীবন শুরু করি। ২০১৯ সালে আমার স্বামীর কাছ থেকে হঠাৎ ডিভোর্স লেটার পাই। আমি আর তাদের কাছে সংসার ফেরতের জন্যে অনুরোধ করিনি, আমি নিজেই আমার একমাত্র সন্তান (ছেলে) নাহির কে নিয়ে আমার একা পথ চলা শুরু করি, তবে আমার মা—বাবা—ভাই—বোন না থাকায় আমাকে কোন সহযোগিতা করার কেউ নেই। ২০২১ এ আমি একটি রোড এক্সিডেন্ট করে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসি। আমি এই এক্সিডেন্টে বাম কানের শ্রবন শক্তি হারাই তবে থেমে থাকিনি, ছেলেকে আমার সেজো মামাকে অনেক অনুরোধ করে তার কাছে রেখে আমি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করতে থাকি, কারণ আমার ছেলেকে দেখার জন্যে ও ভরণ পোষণ চালাতে সাহায্য করার মতো আমার কেউ নেই। প্রতিদিন আমার জন্যে ছেলে কষ্ট পেতো, কান্না করতো, একপর্যায়ে মানষিক সমস্যা দেখা দেয় এবং শারিরীক সমস্যাও দেখা দেয় আমার ছেলের, তবুও স্বান্তনা দিয়ে রাখতাম নিজেকে কারণ আমার ছেলের সব খরচ আমিই বহন করতাম পরিবারের কারো কাছ থেকেই কোন সহযোগিতা আমি পাইনি কখনো। তাই জীবন চালাতে আমাকে শক্ত থেকে কাজ করে যেতে হবে।

২০২১ এ আমার ছেলের প্রয়োজন , সামাজিক প্রেক্ষাপটে বারবার হেয় হওয়ায় এমনকি অনেক পরিচিতজনের কাছেও আমাকে বারবার সেক্সুয়ালী হেরাসমেন্ট হতে হয়েছে। এই অবস্থায় আমার এক আত্মীয়ের বিয়ের প্রস্তাবে আবার বিয়ে হয় মেহেদী হাসান এর সাথে, এতো কিছু ফেস করে আর একা থাকার সহাস করে উঠতে পারিনি আমি। আমার বর্তমান স্বামী পেশায় একজন আর্কিটেক্ট। আমার বর্তমান শশুর বাড়িতে আমাকে সহজ ভাবে মেনে নিলেও আমার ছেলেকে তারা মানষিক ভাবে মেনে না নেওয়ায় আমি আমার ছেলের দায়িত্ব তাদের বা আমার বর্তমান স্বামীকে দিতে পারিনি এবং ছেলেকে রেখে শশুর বাড়িতে তাদের সাথে আমার আর থাকাও হয়নি, আমি শুধু কোন উৎসবে বা কোন বিপদে তাদের কাছে যাই। আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি যে সবার কপালে গুছিয়ে সংসার হয় না। তাই এখনো আমি নিজেই ছেলের সব দায়িত্ব একাই পালন করছি। ২০২৫ এ আমি সিলেটে কর্মরত থাকা অবস্থায় আমার ছেলেটি আমার মামার বাসা থেকে কাউকে কিছু না বলে সিলেটের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। ১১ ঘন্টা পর বাস কাউন্টারের সামনে থেকে তাকে পাওয়া যায় রাত ৮ টায়। ছেলের শারিরিক ও মানষিক দিক বিবেচনা করে আমার কাছে নিয়ে আসি।

 এভাবেই আমার জীবন চলছে আমার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে। আমি আমার জীবনে যতবার হোঁচোট খেয়েছি সুশীলন ছাডা আর কাউকে পাশে পাইনি। এখনো আমি সামনে চলার এনার্জি আমার ছেলের থেকে পাই এবং সাহস যোগায় সুশীলন। সুশীলনের কাছে আমৃত্যু কৃতজ্ঞ থাকবো আমি।  

সংগ্রামী নারীর গল্প সংখ্যা: ২
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র