29 June 2026 Monday, 05:25 AM
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ সোমবার, 05:25 AM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

বিশেষ ফিচার: উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত

26 June 2026 03:04 PM 8 ভিউ মামুন হোসেন, প্রকল্প ব্যবস্থাপক

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলা—প্রকৃতি যেখানে অবারিত সৌন্দর্য ছড়িয়েছে, আবার জলবায়ু পরিবর্তন আর লোনা পানির তীব্রতায় মানুষের জীবনকে করেছে চরম চ্যালেঞ্জিং। এই প্রতিকূল জনপদে প্রান্তিক মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার এক নতুন স্বপ্ন বুনছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলন। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ (World Vision Bangladesh)-এর অর্থায়নে পরিচালিত 'দেবহাটা এরিয়া প্রোগ্রাম' এখন এ অঞ্চলের ৫২টি গ্রামের মানুষের কাছে উন্নয়ন আর স্বাবলম্বিতার নতুন এক নাম। সুশীলন তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে কীভাবে এই দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠীর জীবন মানোন্নয়নে কাজ করছে, তা নিয়ে আজকের এই বিশেষ আয়োজন।

এই দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল জুলাই ২০১৮ সালে এবং এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে সেপ্টেম্বর ২০৩১ সাল পর্যন্ত। বর্তমান ২০২৬ অর্থবছরে প্রকল্পটির মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৯৪০,৬০০ মার্কিন ডলার, যার প্রায় ৭২ শতাংশ অর্থ সরাসরি বাস্তবায়নে কাজ করছে সুশীলন।

অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার: আল্ট্রা-পুর গ্রাজুয়েশন (UPG)

সুশীলনের মূল লক্ষ্য হলো প্রান্তিক মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারে। দেবহাটা এপি-র অধীনে 'আল্ট্রা-পুর গ্রাজুয়েশন (UPG)' মডেলটি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই মডলটির মাধ্যমে মোট ৪,০৭৫টি অতি-দরিদ্র পরিবারকে দারিদ্র্যের বলয় থেকে বের করে আনা হয়েছে।

২০২৬ অর্থবছরেই কুলিয়া, পারুলিয়া, দেবহাটা এবং নওয়াপাড়া—এই ৪টি প্রাইমারি ফোকাস এরিয়া (PFA)-তে ১,২০০টি পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ১০,০০০ টাকা করে শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা (Conditional Cash Transfer - CCT) প্রদান করা হচ্ছে। এই সহায়তার লক্ষ্য কেবল তাৎক্ষণিক অভাব মেটানো নয়, বরং এই অর্থ দিয়ে পরিবারগুলো হাঁস-মুরগি পালন, গাভী পালন কিংবা দর্জি বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ নিয়ে টেকসই আয়ের পথ তৈরি করছে। শারীফার মতো অসংখ্য নারী আজ এই প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন জীবনের দিশা পেয়েছেন, যার একটি গরু আজ একটি স্থায়ী ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং তার সন্তানের ভবিষ্যৎ হয়েছে উজ্জ্বল।

স্বাস্থ্য ও পুষ্টি: সুস্থ প্রজন্মের অঙ্গীকার

সুশীলনের উন্নয়ন ভাবনায় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকল্পের মোট বাজেটের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় করা হচ্ছে স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং WASH (Water, Sanitation, and Hygiene) খাতে। দেবহাটার লবণাক্ত এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। সুশীলন -এর তত্বাবধানে আতাপুর, পূর্ব কুলিয়া ও গালঘালিয়া রহিমপুর এলাকায় ১,০০০ মিটার দীর্ঘ মিনি পাইপলাইন সম্প্রসারণ করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৫০০ পরিবার সরাসরি উপকৃত হচ্ছে।

পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় সংস্থাটি নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ৫,৪০০-এর বেশি শিশুর গ্রোথ মনিটরিং (GMP) এবং ২,৫০০-এর বেশি পরিবারকে মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট পাউডার (MNP) বিতরণের মাধ্যমে অপপুষ্টি রোধে বড় ভূমিকা পালন করা হচ্ছে। গ্রাম পর্যায়ে ৯৫০টি উন্নত ল্যাট্রিন স্থাপন এবং ৩০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে দেবহাটাবাসীর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে সুশীলন।

শিক্ষা ও নেতৃত্বের বিকাশ: আগামীর কারিগর

সুশীলন বিশ্বাস করে, একটি উন্নত সমাজ গঠনের চাবিকাঠি হলো মানসম্মত শিক্ষা। প্রকল্পের অধীনে 'আনলক লিটারেসি (UL)' এবং 'লাইফ স্কিল বেসড এডুকেশন (LSBE)' মডেলের মাধ্যমে হাজার হাজার শিশুকে দক্ষ করে গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রায় ২,৫০০ শিক্ষার্থী এই কার্যক্রমের আওতায় পাঠাগার সেশন এবং জীবনমুখী শিক্ষা গ্রহণ করছে।

তরুণদের নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে 'ইমপ্যাক্ট প্লাস (IMPACT+)' এবং 'ইংলিশ ফর লাইফ (E4L)' ক্লাবগুলো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এর ফলে কোমলমতি শিশুরা কেবল পড়াশোনাতেই নয়, বরং আত্মরক্ষা, যোগাযোগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায়েও সজাগ হচ্ছে।

নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন ও উদ্ভাবনী ব্যাংকিং

দেবহাটা এপি-র অন্যতম বড় সাফল্য হলো নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ। সুশীলন ও ওয়ার্ল্ড ভিশন উদ্ভাবনী ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যাংকের সহায়তায় ৪,৩০০ জন নিবন্ধিত শিশুর মায়ের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে অনুপ্রানিত করেছে।

এই মায়েদের সম্মিলিত জমানো টাকার পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৯৮ লক্ষ টাকা, যা এ অঞ্চলের সমবায় ও ক্ষুদ্র সঞ্চয় আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গড়ে প্রতিটি পরিবার ২,৩১০ টাকা করে সঞ্চয় করেছে, যা তাদের পারিবারিক যেকোনো বিপদে ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং নারীদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়ন বাড়ায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও পরিবেশ রক্ষা

সুশীলন তার নামের সার্থকতা বজায় রেখে পরিবেশ রক্ষায় আপসহীন। দেবহাটার মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে (DRR) সংস্থাটি ৫২টি গ্রাম উন্নয়ন কমিটি (VDC) এবং ৪টি বিশেষায়িত যুব দুর্যোগ কমিটি গঠন করেছে।

পরিবেশগত স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেবহাটায় ৮টি 'ইকো-ভিলেজ' বা পরিবেশবান্ধব গ্রাম এবং ৮টি 'গ্রিন স্কুল' বা সবুজ স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ১০০টি কৃত্রিম পাখির বাসা স্থাপন এবং বজ্রপাত রোধে ৪,০০০ তালগাছ রোপণের মতো প্রশংসনীয় কাজ করেছে সুশীলন, যার মধ্যে ১,৩০০-এরও বেশি গাছ বর্তমানে দৃশ্যমান এবং বেঁচে আছে।

অ্যাডভোকেসি ও শিশু সুরক্ষা: পরিবর্তনের দূত অনামিকা

সুশীলন দেবহাটাকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও বদলে দিতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং শিশু শ্রম রোধে সংস্থাটি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। 'চাইল্ড ফোরাম' এবং 'ইউথ ফোরাম'-এর মাধ্যমে শিশুদের নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা হয়েছে।

দেবহাটার স্থানীয় শিশু অনামিকা পাড় আজ এক পরিবর্তনের প্রতীক। তিনি তার নেতৃত্ব আর সাহসিকতা দিয়ে এলাকায় ৪টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছেন। তার এই অসামান্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আজ স্থানীয় প্রশাসনও যেকোনো বিয়ের নিবন্ধনের আগে চাইল্ড ফোরামের সাথে পরামর্শ করতে উৎসাহী হচ্ছে। এটি সুশীলনের অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমের এক অভাবনীয় বিজয়।

সুশীলনের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য ও দেবহাটা এপি-র মেলবন্ধন

সুশীলন একটি মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংস্থা হিসেবে সবসময়ই পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার। সংস্থাটি কেবল দাতার দেওয়া অর্থ ব্যয় করছে না, বরং নিজস্ব তহবিল থেকেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনী খাতে বিনিয়োগ করছে। যেমন, দেবহাটার নিরাপদ পানির জন্য ১,১০,০০০ টাকা এবং পাখির বাসা স্থাপনের জন্য ১,০০,০০০ টাকার নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটির মূল লক্ষ্য— 'একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ সমাজ গঠন'—যা দেবহাটা এপি-র প্রতিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে ফুটে উঠছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ৪টি সমবায় সমিতি (CBO) নিবন্ধনের মাধ্যমে তারা প্রান্তিক মানুষকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

উপসংহার

দেবহাটার লবণাক্ত মাটি আর বৈরী আবহাওয়ায় সুশীলন যে পরিবর্তনের চারা রোপণ করেছে, তা আজ ডালপালা মেলে মহীরুহে পরিণত হচ্ছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেবহাটা উপজেলা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের একটি মডেল উপজেলা, যেখানে কোনো শিশু শ্রম থাকবে না, কোনো বাল্যবিবাহ হবে না এবং প্রতিটি পরিবার হবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী।

সুশীলন ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের এই সম্মিলিত অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা আর স্থানীয় মানুষের নিবিড় অংশগ্রহণের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব। দেবহাটার মানুষের চোখে আজ যে আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়, তার কারিগর হিসেবে সুশীলন বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সুন্দরবন ও উপকূল অঞ্চল: চর অঞ্চল সংখ্যা: ২
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র