28 June 2026 Sunday, 01:44 AM
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ রবিবার, 01:44 AM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

মানুষ, নেতৃত্ব ও পরিবর্তনের জয়গাথা ঊজই প্রকল্পের সফলতা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অগ্রযাত্রা

26 June 2026 03:55 PM 15 ভিউ শেখ মো: নুরুন নবী প্রিন্স, প্রকল্প সমন্বয়কারী

২০২১ সাল। করোনা মহামারির ভয়াবহতায় পুরো পৃথিবীর মতো বাংলাদেশও এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছিল। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ তো দূরের কথা, প্রতিটি পরিবারে বাসা বেঁধেছিল বেঁচে থাকার শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা। ঠিক এমন সময় ইউএসএআইডি—এর অর্থায়নে এবং সুশীলনের বাস্তবায়নে শুরু হয় “এনভায়রনমেন্ট রেজিলিয়েন্স বিল্ডিং ” প্রকল্পের যাত্রা। একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। তাঁদের আন্তরিকতা, পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধ ছাড়া এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না।

খুলনা শহরের ছোট—বড় প্রায় ১১০টি বস্তিতে বিপুল সংখ্যক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাস। এসব বস্তিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ছিল। সচেতনতার অভাব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে সেখানে কোনো কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ জীবিকা হারিয়ে প্রতিনিয়ত শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে এবং তাদের একটি বড় অংশ খুলনা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে বস্তিগুলোতে জনসংখ্যার চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অপরিচ্ছন্নতা, অনিয়ম, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এই বাস্তবতায় ঊজই প্রকল্পটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে সুশীল সমাজ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে কাজ শুরু করে।

প্রকল্পের শুরুতেই খুলনা শহরের প্রধান প্রধান বস্তিগুলোকে কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বিত সভা আয়োজনের মাধ্যমে তাদের অধিকার, নাগরিক দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা হয়। পরবর্তীতে কমিউনিটির সদস্যদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এসব দলের মতামত ও সমস্যাগুলো সংগ্রহ করে সুশীল সমাজের মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর কাছে উপস্থাপন করা হয় এবং অ্যাডভোকেসি গ্রুপের মাধ্যমে দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়।

এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে ২০২২ সালে খুলনা শহরে প্রথমবারের মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে একটি মনিটরিং ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়, যা দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর স্বীকৃতি লাভ করে। বস্তির ময়লার ভাগাড়গুলো ধীরে ধীরে সবজি বাগানে রূপান্তরিত হয়। নিরাপদ পানির সংকট নিরসনে প্রকল্পটি বেসরকারি খাতের সাথে সমন্বয় করে শহরের সাতটি ওয়ার্ডে সাতটি ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপন করে, যার মাধ্যমে প্রায় ১৪,০০০ প্রান্তিক মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা লাভ করে। একইসাথে খুলনা সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরের স্বীকৃতিতে ওয়ার্ড নম্বর ৫ ও ৯—কে “মডেল ওয়ার্ড” হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৩ সালে প্রকল্প বাস্তবায়িত এলাকাগুলোতে দৃশ্যমান উন্নয়ন সাধিত হয়। বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা উন্নয়ন, কমিউনিটি ল্যাট্রিন নির্মাণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ওমেন ক্লাব প্রতিষ্ঠা, ড্রেন ও স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণসহ নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে বাড়ি বাড়ি ময়লা সংগ্রহের ভ্যান, ডাম্পিং পয়েন্ট এবং সেকেন্ডারি ওয়েস্ট ট্রান্সফার সিস্টেম আরও শক্তিশালী করা হয়। এসব কার্যক্রমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সুশীল সমাজ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

এই গুরুত্বপূর্ণ অর্জনসমূহের পেছনে প্রজেক্ট টিম, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং সুশীল সমাজের সম্মিলিত ও অক্লান্ত পরিশ্রম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২২—২০২৩ সময়ে প্রকল্পটি সাতটি বস্তিতে মোট ২৪০টি ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশন পরিচালনা করে, যার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরসমূহের সেবা, সহায়তা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও অবগত করা হয়। পাশাপাশি ২০টি লিডারশিপ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ জন কমিউনিটি সদস্যকে দলগতভাবে কমিউনিটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা হয়, যা স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত পাঁচটি মানববন্ধনের মাধ্যমে প্রায় ২,৫০০ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের দাবিদাওয়া সরকারের কাছে সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে আটটি সফল প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে মানববন্ধনে উত্থাপিত দাবিগুলো জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যার ফলে বিষয়গুলো নীতিনির্ধারক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর দৃষ্টিগোচর হয়। এছাড়াও ২২টি রাউন্ড টেবিল বৈঠকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং গৃহীত নীতিমালার বাস্তবায়নে উৎসাহিত করা হয়।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা, সম্ভাবনা ও সমাধানকে জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরতে প্রকল্পের আওতায় ২০টি ডকুমেন্টারি এবং ৪টি টেলিভিশন টকশো নির্মাণ ও প্রচার করা হয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে নগর প্রান্তিক মানুষের বাস্তব চিত্র বৃহত্তর সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের সামনে উপস্থাপিত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে ইউএসএআইডি—এর ১২টিরও বেশি ডোনার ভিজিট সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। প্রকল্পের কার্যক্রমে মুগ্ধ হয়ে ইউএসএআইডি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং সাউথ এশিয়ার ফাইন্যান্স কো—অর্ডিনেটর সরাসরি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন এবং প্রকল্পটিকে একটি মডেল প্রকল্প হিসেবে আখ্যায়িত করেন ।

প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল নীতিগত পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়ন। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে খুলনা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (কউঅ) ভবন নির্মাণ নির্দেশিকায় একটি নতুন সূচক সংযোজন করে, যেখানে পরিকল্পিত ভবন নির্মাণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০২৩ সালের আগস্টে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়। এ পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দাবি ও প্রয়োজনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সুশীল সমাজ ও কমিউনিটির সাথে যৌথভাবে কাজ করা হয়। ফলস্বরূপ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্যানিটেশন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রাস্তা উন্নয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বাড়তি বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি স্থান পায়। নির্বাচন—পরবর্তী সময়েও বিজয়ী প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়।

সবশেষে বলা যায়, ঊজই প্রকল্পটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি ছিল প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং অংশগ্রহণমূলক নগর উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সুশীল সমাজ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা দৃঢ় সম্পর্ক যা আজও বহমান রয়েছে। সুশীলনের এই অবদান ভবিষ্যতেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রেরণা হয়ে থাকবে।

সমাপ্ত প্রকল্প সংখ্যা: ২
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র