28 June 2026 Sunday, 01:42 AM
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ রবিবার, 01:42 AM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

নীরবতা ভেঙে নেতৃত্বে: সুন্দরবনের বনজীবী নারীদের জাগরণের গল্প

26 June 2026 03:47 PM 11 ভিউ শাহিনা পারভিন, উপ—পরিচালক ও প্রধান আইএমইএল সেল

এক সময় সুন্দরবন নির্ভরশীল যে সব নারীরা ছিলেন নীরব, ঘরের চার দেয়ালে বন্দি, নিজের সুবিধা—অসুবিধার কথাটুকু প্রকাশের সুযোগও ছিল না। আজ তারাই সুন্দরবনের উপকূলজুড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং পরিবর্তনের পথ দেখাচ্ছেন। এই রূপান্তরের গল্প কেবল কয়েকজন নারীর নয়, এটি একটি কমিউনিটির জেগে ওঠার গল্প। বলছিলাম সুন্দরবন নির্ভরশীল সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন এবং খুলনার দাকোপ উপজেলার বাণিয়াশান্তা ও সুতোরখালীর বনজীবী নারীদের কথা। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে সুন্দরবন নসংলগ্ন এলাকাগুলো, দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র‍্য, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই বাস্তবতায় টেকসই উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং শক্তিশালী স্থানীয় নেতৃত্ব বিশেষ করে নারীদের নেতৃত্বে একটি বড় অংশগ্রহণ।

সুশীলন ১৯৯১ সাল থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন, বিশেষ করে নারীদের নেতৃত্ব বিকাশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায়। নারীবান্ধব প্রতিষ্ঠান সুশীলন বিশ্বাস করে সহজ সরল এই হতদরিদ্র নারীরা একটু সুযোগ পেলেই হয়ে উঠতে পারে— নিজেরাই উন্নয়নের চালিকাশক্তি; প্রয়োজন শুধু সুযোগ, সহায়তা এবং তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। এই বিশ^াসকে সামনে রেখে সুশীলন ২০২৩ সালে ল্যান্ডেসা—এর অর্থায়নে শুরু করে ম্যানগ্রোভ, ফরেস্ট, ক্লাইমেট চেঞ্জ এ্যান্ড লাইভলীহুড (এমএফসিসিএল) প্রকল্প কার্যক্রম। প্রকল্পটি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র‍্য রক্ষা নিয়ে কাজের পাশাপাশি বনজীবী নারীদের ক্ষমতায়ন, ভূমির অধিকার নিশ্চিতকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ মানুষের জীবন ও জীবিকার পরিবর্তনের একটি সমন্বিত প্রয়াস। শুরুর দিকে প্রকল্পটি মাত্র চারটি গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে  এই উদ্যোগ ২০২৫ সালের মধ্যে ৪০ টি গ্রামে বিস্তৃতি লাভ করে। সহ—ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি), পিপলস ফোরাম (পিএফ) এবং গ্রাম সংরক্ষণ কমিটি (ভিসিএফ)—এর মতো বিদ্যমান কাঠামোগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি, ভিসিএফ—এর কার্যক্রমকে আরও সক্রিয় ও অংশগ্রহণমূলক করতে গঠন করা হয় ছোট ছোট সাব—ভিসিএফ গ্রুপ । এই ছোট ছোট দলগুলো সবগুলিই গঠন করা হয় নারী নেতৃত্বে যা হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের প্রাণকেন্দ্র।

আজ ৫৯ টি ভিসিএফ ৫৯ জনই নারী নেতৃত্বের মাধ্যমে ৭,৩৯৬ জন বনজীবী পরিবারকে ২৪২ টি সাব—ভিসিএফ গ্রুপের মাধ্যমে পরিচালনা করছে যা শুনতে গল্প মনে হলেও এক অভূতপূর্ব অর্জন উপকূলবন্ধুর নেতৃত্বে সুশীলনের। শুরুতে যেখানে প্রকল্পের কর্মীরা সভা পরিচালনা করত সেখানে এখন স্থানীয় নারীরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন, পরিচালনা করছেন সভা —এটি শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর নয় বরং দক্ষ নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। এই নারীদের গল্পগুলো অনুপ্রেরণার। দাকোপের কালাবগি গ্রামের খাদিজা আক্তারÑযিনি স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে একদিন ছিলেন বাকরুদ্ধ আজ তিনি নিজেই দাঁড়িয়েছেন— নেতৃত্ব দিচ্ছেন শত শত বনজীবী নারী ও পুরুষের দলকে। আবার সাতক্ষীরার সিংহরতলীর রেহানা বেগম যিনি ধর্মীয় ও সামাজিক বাঁধা অতিক্রম করে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একাধিক দল। এমন প্রতিটি নারীই আজ সংগ্রাম এবং সম্ভাবনার একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

সুশীলন এই নারীদের শুধু সুযোগ দেয়নি, তাদের সক্ষম করে তুলেছে। শিখিয়েছে কিভাবে বর্তমান ডিজিটাল টেকনোলজির যুগে হোয়াটএ্যাপ গ্রুপ করে সহজে সকলের সাথে যোগাযোগ করা যায়, কিভাবে অনলাইনে সভা করা যায়, কিভাবে একটি দলকে সাংগঠনিক রুপ দেয়া যায়। ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুশীলন এই নারীদের দক্ষ নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা, অ্যাডভোকেসি এবং জলবায়ু সহনশীলতায় ভূমিকা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সুশীলন তাদের শিখিয়েছে কিভাবে সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরগুলি থেকে সহায়তা পাওয়া যায়, কিভাবে অন্যান্য সমমনা সংস্থা, নেটওয়ার্কের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হয় । নিজেদের সমস্যা নিজেরাই মোকাবিলা করা যায়। ফলে এ সকল নারী নেত্রীরা আজ একে অপরের পাশে থাকার মতো একটি শক্তিশালী সহায়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে যা তাদের আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে।

এখন তারা নিয়মিত সাব—ভিসিএফ সভা পরিচালনা করছেন, যেখানে কমিউনিটির সমস্যা চিহ্নিত করা হয় এবং আলোচনা করে সমাধানের পথ খেঁাজা হয় এমনকি প্রয়োজনে বনজীবীদের নানা সমস্য সমাধানে তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অবৈধ বন প্রবেশ, জীবিকার সংকট, বননির্ভরতার ঝুঁকি কিংবা সামাজিক বৈষম্য, দূর্যোর্গের পূর্ব প্রস্তুতি, দূর্যোগের সময় করনীয় সব বিষয়েই তারা সচেতন। শুধু তাই নয়, ইউনিয়ন পরিষদ, বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে তারা হয়ে উঠেছেন কমিউনিটির কণ্ঠস্বর।

তাদের এই সক্রিয় ভূমিকার ফলাফলও দৃশ্যমান। ইতোমধ্যে ৪৭ জন ভূমিহীন নারী ডিসিআর দলিল পেয়ে জমির অধিকার নিশ্চিত করেছেন যা তাদের জীবনে স্থিতিশীলতা ও মর্যাদা এনে দিয়েছে।

আজ এই ৫৯ জন নারী নেত্রী শুধু নিজেদের জীবনই বদলাননি, তারা বদলে দিয়েছেন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। তারা দেখিয়েছেনÑপরিবর্তন শুরু হয় সাহস থেকে, আর সেই সাহস যখন একত্রিত হয়, তখন তা একটি পুরো কমিউনিটিকে আলোকিত করতে পারে। সুন্দরবনের এই নারীরা আর নীরব নন, তারা এখন পরিবর্তনের আলোকবর্তিকা

সুন্দরবন ও উপকূল অঞ্চল: চর অঞ্চল সংখ্যা: ২
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র