12 May 2026 Tuesday, 12:24 AM
২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ মঙ্গলবার, 12:24 AM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

শিশুসুরক্ষা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সুশীলনের অবদান

13 April 2026 05:38 PM 32 ভিউ জি এম মনিরুজ্জামান, উপ-পরিচালক, সুশীলন

শিশুসুরক্ষা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সুশীলনের অবদানঃ

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিশুসুরক্ষা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সুশীলনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয়। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, শিশুদের অধিকার রক্ষা, শিক্ষা প্রসার এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতাবৃদ্ধি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে ।কমিউনিটি পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিশু ও যুব ফোরাম গঠন, সক্ষমতাবৃদ্ধি কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে সুশীলন একটি নিরাপদ, সমতাভিত্তিক ও শিশু-বান্ধব সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের নিবিড় বাস্তবায়নে ‘দেবহাটা এরিয়া প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই অঞ্চলে শুরু হয়েছে শিশু সুরক্ষার এক মহাকাব্যিক জয়যাত্রা। ২০১৮ সাল থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে পরিচালিত এই প্রকল্পের প্রতিটি পদক্ষেপ আজ সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলাকে সারা দেশের জন্য শিশু সুরক্ষার এক অনন্য মডেলে রূপান্তরিত করেছে। দেবহাটা ছাড়াও এই সামাজিক আন্দোলনের চিত্র সুশীলন বাস্তবায়ন করে চলেছে সিলেট, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনা, সাতক্ষীরা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশু সুরক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার এই ধারা বিস্তৃত করে চলেছে। এই ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, সহিংসতামুক্ত এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে,যেখানে প্রতিটি শিশু তার অধিকার নিয়ে বেড়ে উঠতে পারবে এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশীদার হবে।

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সবচেয়ে উজ্জ্বল মাইলফলকটি স্থাপিত হয় গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেবহাটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাল্যবিবাহ মুক্ত উপজেলা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণাটি ছিল দেবহাটার ১,২৫,৩৫৮ জন মানুষের জন্য এক নতুন স্বাধীনতার সূর্যদয়। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক আয়োজন ছিল না, বরং সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব বিষ্ণুপদ পালের উপস্থিতিতে প্রায় ৫৮০ জন স্টেকহোল্ডার, সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির এক সম্মিলিত অঙ্গীকারের ফসল ছিল এই অনুষ্ঠান। এই লক্ষ্য অর্জনে সুশীলন যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। প্রকল্পের শুরুতেই উপজেলার প্রতিটি প্রান্তের ১১,০০৭টি পরিবারের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ডাটাবেজ বা তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়। এই ডাটাবেজের মাধ্যমে ৭,৬৭৯ জন শিশুকে চিহ্নিত করা হয় যারা বয়সের কারণে বিবাহের উচ্চ ঝুঁকিতে ছিল। এদের মধ্যে ৪,৩৫৮ জন ছেলে এবং ৩,৩২১ জন মেয়ে। প্রকল্পের কর্মীরা নিয়মিত এই পরিবারগুলো পরিদর্শন করে এবং ‘ইয়ুথ এম্পায়ার’ ও ‘চাইল্ড ফোরাম’-এর স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে কড়া নজরদারি বজায় রাখে।

২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই সজাগ দৃষ্টির ফলেই ৩৬টি বাল্যবিবাহ একেবারে বিয়ের পিঁড়ি থেকে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। শুধুমাত্র ২০২৪ সালের প্রথম আট মাসেই ৫টি বিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে এবং ওই শিশুদের পুনরায় শিক্ষা জীবনের মূলধারায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে সুশীলন ৬০,০০০ কপি লিফলেট এবং হাজার হাজার পোস্টার বিতরণ করেছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ২৪০টি সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে সমাজের অংশীজনদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। সুশীলন ১২৫ জন ধর্মীয় নেতাকে (ইমাম ও পুরোহিত) বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করেছে যারা শপথ নিয়েছেন যে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্কের বিবাহ তারা পড়াবেন না। এছাড়া ১৮০ জন ‘মেনকেয়ার’ (Men Care) দম্পতি বর্তমানে সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে এবং কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় পাহারাদারের কাজ করছেন। উপজেলার ৩০ জন কাজীকে আইনি ও সামাজিক বিষয়ে সচেতন করার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে কোনো ভুয়া জন্মসনদ দিয়ে যেন বিবাহ রেজিস্ট্রি না হয়।

বাল্যবিবাহ নিরসনের এই সফলতার পর সুশীলনের দ্বিতীয় বড় যুদ্ধ ছিল শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে। উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্য অনেক সময় মা-বাবাকে বাধ্য করে তাদের সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে ইটের ভাটায় বা মৎস্য ঘেরে কাজে পাঠাতে। এই করুণ বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ঐতিহাসিক ঘলঘলিয়া ফুটবল মাঠে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে দেবহাটা ইউনিয়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত ইউনিয়ন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সুশীলন সরাসরি ৮০ জন ঝরে পড়া শিশুকে চিহ্নিত করেছিল যারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ছিল। এই শিশুদের উদ্ধার করার পর তাদের জীবনে পরিবর্তন আনতে সুশীলন একটি সমন্বিত পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। প্রথম ধাপে শিশুদের এবং তাদের অভিভাবকদের নিবিড় মানসিক সহায়তা বা কাউন্সেলিং দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে, এই ৮০ জন শিশুকে পুনরায় স্কুলে পাঠাতে বিশেষ ‘ব্রিজ এডুকেশন’ বা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয় এবং তাদের স্কুল ব্যাগ, বই, খাতা ও ইউনিফর্ম প্রদান করা হয়।বর্তমানে দেবহাটা ইউনিয়নের এই সফল মডেলকে ভিত্তি করে ২০২৬ সালের মধ্যে সমগ্র দেবহাটা উপজেলাকে শিশুশ্রম মুক্ত করার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের সাথে যৌথভাবে ৪৫টি ওয়ার্ড মনিটরিং কমিটি এবং গ্রাম উন্নয়ন কমিটি (ভিডিসি) কাজ করে যাচ্ছে।

শিক্ষাই হলো বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রধান স্থায়ী অস্ত্র। দেবহাটা এরিয়া প্রোগ্রামে শিক্ষা খাতের কার্যক্রম অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং বিস্তৃত। সুশীলন শিশুর প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কাজ করছে। ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এলাকায় ‘শিখন শেকড়’ বা লার্নিং রুটস সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এটি কেবল একটি স্কুল নয়, বরং শিশুর মেধা বিকাশের একটি আনন্দময় কেন্দ্র।

সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুশীলন বাংলাদেশ আইনের চেয়ে সাংস্কৃতিক রূপান্তরকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতি বছর ৫২টিরও বেশি পট গান ও লোকজ নাটকের আয়োজন করা হচ্ছে। পট গান হলো এমন এক শিল্পমাধ্যম যেখানে একটি আঁকা চিত্রের মাধ্যমে গানের তালে তালে গল্প বলা হয়।

বর্তমানে এই প্রকল্পের সরাসরি উপকারভোগী শিশুর সংখ্যা প্রায় ২৯,৯১৩ জন। সরকারি ও বেসরকারি এই সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেবহাটা উপজেলা আজ বাল্যবিবাহ মুক্ত এবং একটি ইউনিয়ন শিশুশ্রম মুক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এটি টেকসই উন্নয়নের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শিশু ও যুব ফোরামের সদস্যরা এখন নিজেরাই তাদের এলাকার পাহারাদার। তারা বাল্যবিবাহের খবর পাওয়ামাত্র প্রশাসনকে অবহিত করছে। কাজী, ঘটক এবং ধর্মীয় নেতারা এখন নিজ থেকেই বাল্যবিবাহের প্রস্তাবে ‘না’ বলছেন।

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার এই অভাবনীয় রূপান্তর কোনো অলৌকিক ঘটনায় হয়নি। এটি ছিল  দীর্ঘমেয়াদী  ওয়াল্ড ভিশনের অর্থায়ন এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। স্থানীয় প্রশাসন এবং সর্বোপরি দেবহাটার সাহসী মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ফলেই আজ এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

এ ছাড়াও বাল্য বিবাহ, শিশু স্বাস্থ্য, মাতৃ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইউনিসেফ, প্লান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, ইউএসএইড, আই আর সি, এ্যাকশন এইড এর অর্থায়নে সাতক্ষীরা, খুলনা, ভোলা, বরগুনা, সিলেট, কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নারী এবং শিশু সুরক্ষার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।

জিএম মনিরুজ্জামান

উপ-পরিচালক, সুশীলন

 

মানবিক সহায়তায় সুশীলন সংখ্যা: ১
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র