29 June 2026 Monday, 05:27 AM
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ সোমবার, 05:27 AM
155, Jalil Sharoni, Rayermohol, Boyra, Khulna 9000
+880 1915 319448  |  info@shushilan.com
ব্রেকিং নিউজ

কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের টেকসই জীবিকায় নতুন দিগন্ত: সুশীলনের উদ্যোগে দক্ষতা, আয় ও আত্মনির্ভরতার

26 June 2026 03:00 PM 8 ভিউ মো: গোলাম কিবরিয়া, প্রকল্প সমন্বয়কারী

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত হাজারো মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে জাতীয় উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের বাস্তবায়িত একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রকল্প। Global Affairs Canada (GAC) Ges Department of Foreign Affairs and Trade (DFAT) এর আর্থিক সহযোগিতায় এবং ইজঅঈ এর আর্থিক ব্যবস্থাপনার (পুলড ফান্ডের) মাধ্যমে পরিচালিত “ÒSustainable and Inclusive Gender Equitable Livelihood Support for Rohingya Refugees in Cox’Bazar” শীর্ষক প্রকল্পটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আয়মুখী কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে আর্থিক সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা শিবিরের পরিবারগুলো মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দিনদিন মানবিক সহায়তার পরিমানও কমে এসেছে। পাশাপাশি চলাচলে সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা মানবেতর জীবনযাপন করে। যেখানে পুরুষদেরই কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই সেখানে নারীদের কথা তো কল্পনাই করা যায়না। এছাড়া ধর্মীও ও সামাজিক কুসংস্কারের কারণে রোহিঙ্গা নারীদেরকে বাহিরে কাজ করার ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুশীলনের এ প্রকল্পটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

প্রকল্পটি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ২ ইস্ট ও ৪ এক্সটেনশনে মোট ৬০০ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরষ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে হস্তশিল্প (জুট ক্রাফট, বাঁশ ও বেত, নকশিকাঁথা এবং শীতল পাটি বয়ন) এর উপর ২৪ দিনের (১২০ ঘন্টার) দক্ষতা উন্নয়ন মূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে তারা তাদের শেল্টারে বসে হস্তশিল্প পন্য উৎপাদন এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে পারে।

শুধু প্রশিক্ষণেই সীমাবদ্ধ না থেকে, সুশীলন অংশগ্রহণকারীদের বাজারের সাথে সংযোগ স্থাপনে কাজ করেছে। বিভিন্ন মেলা, ক্রেতা—বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সাথে সভা সহ বিভিন্ন বাজার সংযোগ কার্যক্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্যের বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে অংশগ্রহণকারীরা ইতোমধ্যে নিজস্ব আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন এবং পরিবারে অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আউটকাম এ্যাসেসমেন্ট, অংশগ্রহনকারীদের ইনকাম রেজিষ্টার এবং তৃতীয় পক্ষ কতৃর্ক এন্ডলাইন সার্ভের রিপোর্ট অনুযায়ী ৬০০ অংশগ্রহনকারীর মধ্যে ৫৫৪ জন অর্থাৎ ৯২% নিয়মিত আয় করছে এবং তাদের গড় মাসিক আয় ৫৯১১ টাকা।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী নারী, যা নারী ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী প্রশিক্ষণ এবং সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রকল্পটি শুধু আয় বৃদ্ধি নয়, সামাজিক পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে জেন্ডার সমতা, নারী অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে গঠিত আত্মনির্ভরশীল দল (Self Help Group) অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সঞ্চয় ও বাজারমুখী উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

স্থানীয় প্রশাসন,  Camp in Charge (CiC), সিআইসি অফিস, বিভিন্ন সরকারি—বেসরকারি সংস্থা এবং Livelihood and Skill Development (LSDS) সেক্টরের সমন্বয়ে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন, এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে বাস্তবায়িত হলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।

প্রকল্পের অংশগ্রহনকারী নূরনাহার বলেন, “আমি এখন খুবই খুশি। আমার স্বামী নেই, এবং দুই সন্তান নিয়ে আমি অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলাম। সুশীলন থেকে হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পাওয়ার পর আমি এখন পাটের ব্যাগ তৈরি করি এবং মাসে ৮,০০০ থেকে ৯,০০০ টাকা আয় করি। ঘরের খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছি এবং এক জোড়া স্বর্ণের দুলও কিনতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন হলো আমার সন্তানদের শিক্ষিত করা এবং পাটজাত পণ্যের ব্যবসা সম্প্রসারণ করে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।”

ক্যাম্প ২ ইস্টের সিনিয়র সহকারী সচিব ও ক্যাম্প ইন চার্জ (CiC) এনামুল হাসান ক্যাম্পে কর্মরত সকল এনজিও ও আইএনজিওদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় বলেন, “জীবিকা উন্নয়নে কাজ করলে সুশীলনের মতো করা উচিত। পুল্ড ফান্ডের মাধ্যমে সুশীলন ক্যাম্পগুলোতে যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবিকা উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসন হয়ে যেখানেই যাবে তাদের এই অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সেখানে মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। আমি আশা করি সুশীলন এই উদ্যোগ আরও স¤প্রসারিত করবে।”

এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে সুযোগ, দক্ষতা ও সহায়তা পেলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও হতে পারে আত্মনির্ভর, উৎপাদনশীল এবং সম্মানজনক জীবনের অধিকারী।

প্রকল্পের সফলতা এবং ক্যাম্পে প্রকল্পের ব্যপক চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দাতা সংস্থা প্রকল্পটির মেয়াদ পূনরায় জানুয়ারী ২০২৬ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে এবং বর্ধিত সময়ে নতুন করে ২০০ জন রোহিঙ্গা সদস্যকে ৫টি বিষয়ের উপর হস্তশিল্প ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

মানবিক সহায়তায় সুশীলন সংখ্যা: ২
ব্যাঘ্রতট - সুশীলন মুখপাত্র